দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণনীতি ফাঁস করে দিতে পারত যে শব্দছক
"মনসা চিন্তিতং কর্ম বচসা ন প্রকাশয়েৎ।
অন্যলক্ষিতকার্যস্য যতঃ সিদ্ধিঃ ন জায়তে।।"
~চাণক্য
অর্থাৎ : কাজের পরিকল্পনা মনে থাকুক কিন্তু তা যেন বচনে প্রকাশ না পায়। যে কাজের খবর আগেই অন্যের লক্ষ্য গোচর হয়েছে সেই কাজে সিদ্ধি আসেনা। একটা ছোট্ট অসাবধানতাই আপনার সমস্ত পরিকল্পনাকে বানচাল করে দেবার জন্য যথেষ্ট।
লিখছি এরকমই একটি ছোট্ট অসাবধানতার গল্প। সময়টা ১৯৪৪ সাল। সারা পৃথিবী জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আঁচ। ইওরোপের সিংহভাগ অঞ্চল হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি জার্মানীর অধিকারে। অক্ষশক্তির দৌরাত্ম্য দিনদিন বেড়েই চলেছিল। দিকে দিকে ছুটে চলেছে জার্মানীর অশ্বমেধের ঘোড়া। সেই ঘোড়া রোখার সাধ্য নেই কারো। কিন্তু, চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়।
এরই মধ্যে নাৎসি জার্মানী তার রণনীতিতে একটি বিশাল বড় ভুল করে বসল। ১৯৩৯ সালে সোভিয়েতের সাথে করা ১০ বছরের অনাক্রম চুক্তি লঙ্ঘণ করে আক্রমণ করে বসল সোভিয়েত রাশিয়া। অনাক্রম চুক্তির ভরসায় সোভিয়েত যুদ্ধের ব্যাপারে কিছুটা উদাসীনই ছিল। ফলে রাশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল চলে গেল জার্মান নিয়ন্ত্রিত অক্ষশক্তির দখলে।
সোভিয়েত আক্রান্ত হবার পর নাৎসি বিরোধী জনমত ও মিত্রশক্তির ভিতরে, পশ্চিম রণাঙ্গনের পাশাপাশি ইওরোপে একটি দ্বিতীয় রণাঙ্গন খোলার জোড়ালো দাবী ওঠে। কিন্তু লণ্ডন এ ব্যাপারে ততটা আগ্রহী ছিল না। অবশ্য সেরকম সেনাবলও সেই সময় হাতে ছিল না মিত্রশক্তির। ইতালীর যুদ্ধে বেনিতো মুসোলিনির পতন হলেও নাৎসিরা অক্ষশক্তির হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে তখনোও। এই যুদ্ধের অসম্ভব রকম দীর্ঘসূত্রিতা মিত্রশক্তিকে নিঃসন্দেহে একটু চাপে রেখেছিল।
সোভিয়েত কিন্তু আক্রান্ত হবার পর হাত পা গুটিয়ে বসে থেকেনি। ২৩ আগস্ট ১৯৪২ থেকে ২ ফেব্রুয়ারী ১৯৪৩ পর্যন্ত পাঁচ মাস, দশ দিন ব্যাপি চলা স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধে নাৎসি বাহিনীকে উচিৎ শিক্ষা দিয়েছে। এছাড়াও লেনিনগ্রাদ, কুরুর্স্ক সহ সোভিয়েত সীমার মধ্যে নাৎসি বাহিনীর সাথে তারা এতটাই বিক্রমের সাথে যুদ্ধ করছিল যে সাধারণ মানুষ সোভিয়েতকেই নাৎসিদের হাত থেকে পৃথিবীর মুক্তিদাতা হিসাবে ধন্য ধন্য করতে লাগল।
এই পরিস্থিতিতে লন্ডণ ও ওয়াশিংটনের কাছে ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকুলে একটি দ্বিতীয় রণাঙ্গণ খোলা একপ্রকার বাধ্য বাধকতা হয়ে দাঁড়াল।
৪১ সাল থেকে টালবাহানা হতে হতে ৪৪ সালে এসে বহু কাঙ্খিত দ্বিতীয় রণাঙ্গন এর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মুখে। মিত্রশক্তি যুদ্ধের সুবিধার জন্য গোটা উপকুলটিকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে নিয়েছিল। পাঁচটি ভাগের সাংকেতিক নাম রাখা হল Utah, Omaha, Juno, Gold, sowrd, সমগ্র নৌবহরের সাংকেতিক নাম রাখা হয়েছিল Neptune আর গোটা কর্মকান্ডটির সাংকেতিক নাম রাখা হয়েছিল "Operation Overlord"।
যেহেতু নরম্যান্ডি উপকুলে কোন স্থায়ী সমুদ্র বন্দর ছিলনা, তাই যুদ্ধের সুবিধার্থে মিত্রশক্তি একটি ভাসমান অস্থায়ী পোতাশ্রয় ব্যবহার করেছিল। এই পোতাশ্রয়ের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল Mulberry। এছাড়াও যেই দিনটিতে নরম্যান্ডি উপকুলে আক্রমণ চালানো হবে, সেই দিনটির সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল D-day।
একথা সত্যি যে ইংলিশ চ্যানেল পার করে নরম্যান্ডিতে যুদ্ধে যাওয়া অনেকাংশে ঝুঁকিপুর্ণ ছিল। প্রধানত এই কারণ দেখিয়েই বেশ কয়েকবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এই অপারেশন নিয়ে কিছুটা কিন্তু কিন্তু করেছিলেন। তবে সফল ভাবে আক্রমণ শুরু করার পর এই চার্চিলই আবার অপারেশন ওভারলর্ডকে বিশ্বে সব থেকে বড় "উভচর সমরাভিযান" নামে আখ্যায়িত করেছিলেন৷
১৯৪৪ সালের জুন মাসের ১ তারিখ অপারেশন ওভারলর্ডের কার্যকরী হবার কথা থাকলেও মিত্রশক্তি সেই সময়ের মধ্যে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত জুন মাসেরই ৫ তারিখ D-day ঘোষিত হল। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে আবহাওয়া এতটাই খারাপ ছিল যে এত বিশাল নৌবহর নিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পার করা একেবারেই দুসাধ্য হয়ে উঠল। ফলে পরদিন অর্থাৎ ৬ তারিখ মধ্যরাতে ব্রিটিশ, কানাডিয়ান, ও মার্কিন সেনাবাহিনীর সম্মিলিত মিত্রবাহিনী আক্রমণ করল ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকুল।
মার্কিন ইতিহাসবিদ স্নাইডারের মতে এই অপারেশনে ১ লক্ষ ৫০ হাজার সৈন্য যুদ্ধ করেছিল। ১৫০০ ট্যাঙ্ক, ৫,৩০০ জাহাজ ও নৌপোত ব্যবহৃত হয়েছিল। ১২ হাজার যুদ্ধ বিমানও ব্যবহৃত হয়েছিল। এছাড়াও ৩ ডিভিসন সেনাকে বিমানে করে নরম্যান্ডির তটভূমিতে নামানো হয়েছিল। অক্ষশক্তিকে ধোঁকা দেবার জন্য ডোবারের কাছে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে একটি নকল সৈন্য সমাবেশ, এমনকি নকল রেডিও পর্যন্ত লাগানো হয়েছিল। এই পরিকল্পনটি এতই নিখুঁত হয়েছিল যে অক্ষশক্তি নরম্যান্ডির যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত নকল সেনা সমাবেশের ব্যাপারটি ধরতেই পারেনি।
এক বছরের উপর চলা নরম্যান্ডির যুদ্ধে অক্ষশক্তি ব্যাপক ভাবে পর্যদুস্ত হয়। বলা যায় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পিছনে এই যুদ্ধ অন্যতম অনুঘটকের কাজ করেছিল।
জানেন! এই অপারেশনের ৮টি সাংকেতিক নাম, অপারেশন শুরুর আগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল প্রাত্যহিক সংবাদ পত্রের শব্দছক এর মাধ্যমে?
হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন। ওই বছর ফেব্রুয়ারী, মার্চ ও এপ্রিল মাসে "দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ" পত্রিকার তিনটি শব্দছক সূত্রে উত্তর ছিল যথাক্রমে "Juno", " Gold" এবং "Sowrd"। মে মাসের ২ তারিখ একটি সুত্রের (17 across, clued as "One of the U.S.") উত্তর পাওয়া যায় " Utah"। পরিকল্পনা অনুযায়ী নরম্যান্ডি উপকুলের যে দুটি অংশে মার্কিন নৌবহর আক্রমণ করবে বলে ঠিক ছিল তার অন্যতম ছিল "Utah"। ব্যাপারটি সেদিনই এক সেনা অফিসারের নজরে আসে। বলাবাহুল্য এর পর গোয়েন্দা দফতর নড়েচড়ে বসে৷ কিন্তু শব্দছকে সাংকেতিক নাম প্রকাশ আটকানো যায় নি৷ ২২শে মে একটি সূত্র ছিল 3 down, clued as "Red Indian on the Missouri"। পরের দিন সূত্রের উত্তর হিসাবে ছাপা হয় "OMAHA"। এর পাঁচদিন পর ২৭শে মে একটি সূত্র ছিল 11 across, clued as "[common]... but some bigwig like this has stolen some of it at times."। ২৮শে মে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আগের দিনের এই সূত্রের উত্তর ছাপা হয় " Over Lord", যা কিনা খোদ নরম্যান্ডি আক্রমণেরই সাংকেতিক নাম।
এরপর ৩০শে মে একটি সূত্রের উত্তর ছিল "Mulberry" (সূত্রঃ 11 across, clued as "This bush is a centre of nursery revolutions."), ও ১লা জুন একটি সূত্রের উত্তর ছিল "Neptune" (সূত্রঃ 15 down, clued as "Britannia and he hold to the same thing.")। গোয়েন্দা দফতর খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, গত ২০ বছর ধরে "দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ" পত্রিকার শব্দছক তৈরী করছেন স্ট্র্যান্ড বয়েজ স্কুলের প্রধান শিক্ষক লিওনার্ড ডাওয়ে। স্কুলটি বুকহ্যামের হলেও তখন এফিংহামে স্থানান্তরিত হয়ে এসেছে।
আরোও খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে ডাওয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একজন সক্রিয় সেনানী ছিলেন, হ্যাম্পশায়ায় রেজিমেন্টের একদন পদস্থ অফিসার হিসাবেও কাজ করেছেন। ১৯১৭ সালে মেসোপটেমিয়া ক্যাম্পেইনেও তিনি অংশ গ্রহণ করেছিলেন।
৭ই জুন MI5 (মিলেটারি ইন্টেলিজেন্স, সেকশন 5) এর অফিসাররা লিওনার্ড ডাওয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আটক করেন। কিন্তু পর্বত মুষিক প্রসব করল। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের শেষে অফিসাররা মেনে নিতে বাধ্য হলেন যে লিওনার্ড ডাওয়ে আদৌ "অপারেশন ওভারলর্ড" এর পরিকল্পনার বিন্দু বিসর্গও জানতেন না এবং শব্দছকে সাংকেতিক নামগুলি আসার ব্যাপারটি নেহাতই কাকতালীয়।
ঘটনা এখানেই শেষ বলে ভাবছেন? আরে না না! এর পর কেটে গেছে চার দশক। D-day-র ৪০ তম বর্ষপুর্তির পর স্ট্র্যান্ড বয়েজ স্কুলের এক প্রাক্তনী রোনাল্ড ফ্রেঞ্চ সংবাদ মাধ্যমে ফের শব্দছক বিতর্ক উষ্কে দেন। বিবিসিকে দেওয়া এক স্বাক্ষাতকারে তিনি বলেন, এফিংহামে সেনাদের ছাউনির পাশেই ছিল তাদের স্কুল। সেনারা যেহেতু বহুদিন নিজেদের বাড়ি ঘর ছেড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে ছিলেন, সেহেতু স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাদের সান্নিধ্য তারা খুবই পছন্দ করতেন। সেই সূত্রেই সেনা ছাউনিতে স্ট্র্যান্ড বয়েজ স্কুলের ছাত্রদের অবাধ যাতায়াত ছিল। হয়তো স্কুলের ছেলেদের সামনে তারা অতটা সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজন বোধ করেননি। তাই বিভিন্ন সময় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে করতে ছাত্রদের সামনেই এই সমস্ত সাংকেতিক নামগুলি বলে ফেলেছিলেন। রোনাল্ড ফ্রেঞ্চ সেনাদের মুখ থেকে শোনা কিছু অচেনা শব্দ তার নিজস্ব নোটবুকে কৌতুহল বশত টুকে রাখতেন।
স্যার ডাওয়ে মাঝে মাঝেই কিছু খালি শব্দছক তার ছাত্রদের পুরণ করতে দিতেন। যার থেকে তিনি সূত্র তৈরী করে "দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ" পত্রিকার অফিসে পাঠাতেন। রোনাল্ড ফ্রেঞ্চ সেই খালি ছকে তার নোটবুক থেকে কিছু শব্দ তুলে দিয়েছিলেন৷ তবে তিনি দাবী করেন, সেই সময় তিনি আদৌ জানতেন না যে ওই শব্দগুলি কোন সাংকেতিক নাম হতে পারে।
তিনি আরোও বলেন যে ইন্টেলিজেন্স অফিসাররা যাবার পর স্যার ডাওয়ে তাকে ডেকে তার নোটবুকটি দেখতে চান। এরপর তিনি তাকে নোটবুকটি পুড়িয়ে ফেলতে বলেন এবং বাইবেল ছুঁয়ে তাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করান, যেন তিনি এই নোটবুকের কথা কোনদিন কারো কাছে প্রকাশ না করেন।
অক্ষশক্তি এই শব্দছকের সূত্র কি আদৌ ধরতে পেরেছিল? সত্যিই কি এটি একটি কাকতালীয় ঘটনা? নাকি কোন অন্তর্ঘাত কাজ করেছিল?
পুরো ব্যাপারটাই আজও ধোঁয়াশায় ঢাকা। মিত্রশক্তি যুদ্ধ জিতে যাওয়ায়, এবং শব্দছকের সূত্রের দরুণ কোন ক্ষয়ক্ষতি না হওয়ায়, ঘটনা নিয়ে আর বিশেষ কাটাছেঁড়া করা হয়নি৷
কিন্তু একবার ভাবুন তো কোমলমতি কিশোরদের গুরুত্বহীন ভেবে সেনাদের এই ক্ষুদ্র অসাবধানতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় কিভাবে ঘুরিয়ে দিতে পারত! যদি সত্যিই অক্ষশক্তি কোনক্রমে শব্দছকের সূত্র ধরে অপারেশন ওভারলর্ডের সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্য জেনে আগে থেকে সাবধান হয়ে যেত! যদি তার ফলে আগাম প্রস্তুতির সাথে যুদ্ধ করত! তাহলে হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্পুর্ণ বিপরীত একটি ইতিহাসও আমাদের পড়তে হতে পারত।
~সৌরভ মল্লিক


Comments
Post a Comment
Thanx for reading...0