অমৃত আবিস্কার করতে গিয়ে মিলল বারুদ।


আজ একটা সম্পুর্ন কাকতালীয় আবিস্কারের গল্প লিখছি। না, তালগাছ থেকে কাক উড়ে গেল, অমনি একটি তাল খসে মাটিতে পড়ল। এই গল্প সেরকম গল্প নয়। আমাদের গল্প হল অমৃত আবিস্কার করতে গিয়ে ঘটনাক্রমে বারুদ আবিস্কারের গল্প।

প্রাচীন চীন দেশের প্রধান ধর্ম হিসাবে আমরা তাওবাদ সর্বজনগ্রাহ্য। সুতরাং এ কথা সহজেই অনুমেয় যে প্রাচীন চীন দেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে তাওবাদ গুরুত্বপুর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাওবাদী পন্ডিতরা সেই প্রাচীন কাল থেকেই অমরত্বের উপায় সম্বন্ধে অনুসন্ধিৎসু ছিলেন। শরীরচর্চা ও বিভিন্ন ধরনের ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ রাখার নানা পন্থা তারা আবিস্কার করেছিলেন। কিন্তু সেগুলি তো সাময়িক, মানুষকে মৃত্যু থেকে অব্যহতি দেবে তেমন ক্ষমতা কোথায়? খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সু ফু এবং হান চুং নামের দুজন তাওবাদী পন্ডিত 'ফেং-লাই' নামক এক দ্বীপের সন্ধানে পূর্ব সাগরে যাত্রা করেছিলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল 'ফেং লাই' দ্বীপে আছে অমরত্বের মহৌষধী।

সু ফু এবং হান চুং অমোরত্বের সেই মহৌষধ আদৌ পেয়েছিলেন কিনা, বা পেলেও সেই মহৌষধ নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন কিনা, তা নিয়ে ইতিহাস নিরব। কিন্তু এরপর অমরত্বের ঔষধ আবিস্কারের উদ্দেশ্যে শুরু হয় তাওবাদী এ্যালকেমিস্টদের গবেষণা। যুগে যুগে বহু শাসকের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এই গবেষণা।  

বারুদ আবিস্কারের গল্প বলতে গেলে সর্ব প্রথম উল্লেখ করতে হয় হান সাম্রাজ্যে শাসক সম্রাট শুন এর শাসনকালে 'ওয়েই বোয়াং' নামে এক তাও রসায়ণবিদের নাম। ১৪২ খ্রীষ্টাব্দে তিনি তাঁর লেখা 'ক্যান্টং ক্বী' (দ্য কিনশিপ অফ থ্রি) গ্রন্থে তিনটি উপাদানের মিশ্রণে তৈরী একটি বস্তুর কথা উল্লেখ করেন, যা উড়তে পারে, নাচতে পারে। যদিও সেই বস্তুটি যে বারুদই এমন কিছু গ্রন্থটিতে লেখা নেই। কিন্তু বারুদ ছাড়া তিনটি উপাদানে গড়া অন্য কোন বিষ্ফোরক বস্তু আর নেই, সুতরাং বিজ্ঞানীরা ওই বস্তুটিকে বারুদ বলেই অনুমান করে থাকেন। যদিও এসব গবেষণা কোনটাই বারুদ আবিস্কার করার জন্য ছিল না। বরং তাও পন্ডিতদের গবেষণা ছিল অমৃতের খোঁজে। যাইহোক অমৃতর খোঁজ কিন্তু থেমে থাকেনি। এর পরও বহু তাওবাদী এ্যালকেমিস্ট যুগ যুগ ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন অমরত্বের ঔষধ আবিস্কারের। এবিষয়ে দ্বিতীয় যে উল্লেখ যোগ্য নথিটি মেলে, সেইটি তৃতীয় শতকের। জিং সাম্রাজ্যের শাসনকালে কে হং নামে এক তাও এ্যালকেমিস্ট 'বাওপুজি' গ্রন্থে অমরত্বের ওষুধ হিসাবে গন্ধক ও শোরার মিশ্রণের কথা উল্লেখ করেছেন। 
এরও প্রায় সাড়ে তিনশ বছর পর ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে তাও এ্যালকেমিস্ট সান সু মো, গন্ধক (সালফার), শোরা (সল্টপিটার), রজন ও কাঠ কয়লা মিশিয়ে এক ধরণের দাহ্য পদার্থ আবিস্কার করেন, যা জ্বলনশীল বটে কিন্তু বিষ্ফোরক নয়। এই আবিস্কারের সাথে সাথে বারুদ আবিস্কারের খুব কাছাকাছি চলে আসলেন তাও বিজ্ঞানীরা। সদ্য আবিস্কৃত এই দাহ্য অথচ বিষ্ফোরক নয়, পদার্থটিই যে বারুদেরই পুর্বসূরী, সে বিষয়ে বর্তমান ওয়াকিবহাল মহলের মধ্যে কোন সংশয় নেই। 
এরপর নবম শতাব্দীতে এসে সাং রাজাদের শাসনকালের এমন কিছু উল্লেখ্যোগ্য নথি মেলে, যাতে বারুদ প্রস্তুতের প্রণালী হিসাবে কাঠকয়লা, শোরা ও গন্ধকের সঠিক অনুপাত লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। নথিতে আরোও উল্লেখ পাওয়া যায় যে, এই নতুন আবিস্কারের তেজে এ্যালকেমিস্টদের কারো হাত পুড়ে যায় কারো বা মুখ। কিন্তু অমরত্বের দাওয়াই আবিস্কার করতে তারা কোন মূল্যেই পিছু হটেন নি। শেষ পর্যন্ত অমরত্বের ওষুধ আবিস্কার না হলেও তারা কাকতালীয়ভাবে আবিষ্কার করে ফেলেন বারুদ, যা দৈনন্দিন জীবন ও যুদ্ধক্ষেত্রে আমূল বদল এনে দেয়। বারুদের নাম হয় 'হুয়ো ইয়াও', যার অর্থ অগ্নি-ঔষধী। 

বারুদ আবিস্কারের ফলে বদলে যায় যুদ্ধের চেহারা। তীর, ধনুক, ঢাল, তরোয়াল, শেল, শূল, শক্তি, জাঠা, মুষল, মুদগার এসবের দিন ফুরালো, যুদ্ধের ময়দানে এল বড় বড় কামান, ক্ষেপণাস্ত্র, বন্দুক। বারুদের সাহায্যে অনেক বড় বড় যুদ্ধে সহজেই জয় আসতে লাগল। ফল স্বরূপ বারুদই হয়ে উঠল মধ্যযুগের যুদ্ধ বিগ্রহের অন্যতম প্রয়োজনীয়তা। 

অনেকে মনে করেন যে চীনারা প্রথম প্রথম বারুদের  উপাদানগুলির সঠিক মিশ্রণ সম্বন্ধে অজ্ঞাত ছিল। তাই তারা শুরুর দিকে এই বারুদ ব্যবহার করে শুধুই আকাশে বাজি ফাটাতো। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এই ধারণা সম্পুর্ণ ভুল। ১২০০ সাল নাগাদ চীনারা বারুদ ব্যবহার করে বিভিন্ন অস্ত্রও তৈরি করে ফেলে, যেমন অগ্নি গোলক, ছোট রকেট, অগ্নি নিক্ষেপক তীর, বর্শা, এছাড়া সরু নলের মধ্যে বারুদ ভরে তৈরী বন্দুকও তারা ব্যবহার করত।
একাদশ শতকে সাং রাজাদের দরবারের এক আমলা সেং গংলিয়াং-এর লেখা 'ওউজিং সংয়াও' (কালেকশন অফ দ্য মোস্ট ইমপর্ট্যান্ট মিলেটারি টেকনিকস) গ্রন্থে বারুদ নির্ভর বিভিন্ন অস্ত্র শস্ত্রের নাম পাওয়া যায়। সেই সময় বারুদের এতটাই গুরুত্ব ছিল ল, যে বারুদ প্রস্তুত প্রণালীকে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আওতার আনা হয়েছিল। ছয়ের দশক থেকে বারুদের উপাদানগুলির রপ্তানীর উপর নিষেধাজ্ঞা জারী হয় এবং এর কিছু পরে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে গন্ধক ও শোরার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। 

বারুদ আবিস্কারের পর বহু বছর চীনারা বারুদকে তাদের দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পেরেছিল। ৮০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বারুদ আবিষ্কারের পরবর্তী চারশ বছর চীনারা বারুদ এবং বারুদনির্ভর অস্ত্রের রহস্য তাদের দেশেই আটকে রাখতে পেরেছিল। সাং সাম্রাজ্য তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল বারুদের রহস্য তাদের দেশেই লুকিয়ে রাখতে।
কিন্তু এমন এক যুগান্তকারী আবিস্কার খুব সহজে লুকিয়ে রাখা গেল না। ১২২৬ খ্রীষ্টাব্দে উত্তর পুর্ব সীমান্তের জিন সাম্রাজ্য থেকে আসা জুরচেনরা সাংদের আক্রমণ করে তাদের রাজধানী দখল করে নেয়। দশ বছর ব্যাপি চলতে থাকে সাং ও জুরচেনদের মধ্যে যুদ্ধ নিগ্রহ। এই পরিস্থিতিতে খুব সহজেই বারুদ প্রস্তুত প্রণালী আয়ত্ব করে ফেলে জুরচেনরা।  ১২১৪ খ্রীষ্টাব্দে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মঙ্গোলরা জিন সাম্রাজ্য আক্রমণ করে। গোলেমালে মঙ্গোলরাও বারুদ প্রস্তুত প্রণালী শিখে নেয়। 
প্রধানত মঙ্গোলদের থেকেই বহির্বিশ্বে বারুদ প্রস্তুত প্রনালী ছড়িয়ে পড়ে। জুরচেনদের সাথে যুদ্ধের সময় মঙ্গোলদের দলে আলা আলদিন ও ইসমায়েল নামে দুইজন ইরাক দেশীয় মুসলমান প্রযুক্তিবিদ বারুদ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। অনুমান করা হয় সেই দুজন প্রযুক্তিবিদের হাত ধরেই আরব, ইরাক, ইরাণ সহ সমগ্র ইসলামী দুনিয়া বারুদের রহস্য জানতে পারে। 

চীন দেশের বারুদ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার আগে প্রতিবেশী ভারতবর্ষে আসবেনা, তাও কি হয়? ত্রয়োদশ শতকে মঙ্গোলদের হাত ধরে বারুদ এসে পৌঁছায় ভারতে। যদিও সেই সময় তেমন ব্যাপক ভাবে এর ব্যবহার শুরু হয়নি। কিন্তু চতুর্দশ শতকে দিল্লি সলতনত, বাহমনী সলতনত ও বিজয়নগর সাম্রাজ্য বিভিন্ন যুদ্ধে যে বারুদ নির্ভর অস্ত্র ব্যবহার করত, ইতিহাসে তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে ভারত যে বারুদ ব্যবহারে ইসলামী দুনিয়ার থেকে সেই সময় অনেকটাই পিছিয়ে ছিল, তার সব থেকে বড় প্রমাণ হল ১৫২৫ সালে বাবর ও ইব্রাহীম লোদীর মধ্যে হওয়া পানীপথের প্রথম যুদ্ধ। মুঘলদের ব্যবহৃত উন্নত মানের বারুদ নির্ভর অস্ত্রশস্ত্র দিল্লী সলতনতের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


ইওরোপে বারুদঃ- 

ত্রয়োদশ শতকে সিল্করুট দিয়ে চীনদেশী বারুদ ভারত ও মধ্যপ্রাচ্য পার হয়ে ইওরোপে গিয়ে পৌঁছায়। তবে ঠিক কার হাত ধরে বা কবে নাগাদ ইওরোপে বারুদ গিয়ে পৌঁছায়, তা নিয়ে বিস্তর মত বিরোধ আছে। এমনকি বিংশ শতকের প্রথমার্ধেও কতিপয় ইওরোপিয় পণ্ডিত এমন দাবী জানাতেন যে, বারুদ আসলে ইওরোপেরই আবিস্কার। কিন্তু বিংশ শতকেরই শেষার্ধে বিস্তর গবেষণার পর পন্ডিতরা মেনে নেন, বারুদ আসলে চীন দেশেরই আবিস্কার। 

তবে বারুদকে আমরা বর্তমানে যে রূপে পাই, তার পিছনে ইওরোপীয়দের বেশ অনেকখানি অবদান আছে একথা অনৈস্বীকার্য। বারুদের দানার আকারের তারতম্য ঘটিয়ে তার দহনকাল ও শক্তির যে হেরফের ঘটানো সম্ভব তা ইওরোপীয় অপরসায়ণবিদরাই প্রথম আবিস্কার করেন। চীন দেশের মিহি বারুদের পরিবর্তে মোটা দানার বারুদ বন্দুকে ব্যবহার করা আরোও সহজ এবং কার্যকরী হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে তলোয়ার, বর্শার প্রয়োজন সম্পুর্ন ভাবে শেষ করে দেয় নতুন অস্ত্র বন্দুক। 

অমরত্বের ঔষধ মারণাস্ত্রের রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। 

~ শ্রীচিত্রক বর্ম্মা (সৌরভ মল্লিক)

Comments

Popular Posts